মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস – ২০২০ (প্রফেসর রাশিদুল হক, উপ-উপাচার্য্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী)

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস – ২০২০ (প্রফেসর রাশিদুল হক, উপ-উপাচার্য্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী)

আজ অমর একুশ । উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার, বাংলা ভাষা ও বাঙালির প্রতি বিজাতীয় বিরূপতাবোধ এবং আরবি হরফে বাংলা ভাষার প্রচলনের প্রতিবাদের আন্দোলনের দাবানল হলো একুশ | বাংলাদেশের এবং বাঙালির চিরপ্রেরণার প্রতীক হলো একুশ।  সমগ্র বাঙালি জাতি আজ বিনম্র শ্রদ্ধা, যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে ভাষাশহীদদের স্মরণের মাধ্যমে “মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” পালন করছে। তাছাড়া, জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো)  ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় বিশ্বব্যাপী একুশ পালিত হয়ে আসছে। আমরা পৃথিবীতে ছয় নম্বর দেশ, যেখানে সবচেয়ে বেশি নিজের ভাষায় কথা বলা হয়। জেনে খুব গর্বিত বোধ করছি যে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহারের প্রচেষ্টা বাংলাদেশ সরকার অব্যাহত রেখেছে | ইতিমধ্যে, একুশে ফেব্রুয়ারি মহান বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনডিপি) পক্ষ থেকে একটি বাংলা ফন্ট উদ্বোধন করা হয়েছে।  তাছাড়া, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস বাংলাদেশ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সব বাংলা ভাষাভাষীর জন্য ইংরেজি ওয়েবসাইটটির অনেকটাই অনুরূপ বাংলা ভাষায় একটি ওয়েবসাইট চালু করেছে ।

বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় এই দিনটিতে বরাবরের মতো  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফুল দিয়ে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানে গানে শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, অফিসার্স এবং কর্মচারীবৃন্দ  একুশের ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান । সেই স্কুলজীবন থেকে একুশের প্রথম প্রহরে শোকের ও শ্রদ্ধার প্রতীক সাদাকালো পোশাকে, খালি পায়ে, শিশিরসিক্ত পথ মাড়িয়ে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গান গেয়ে এই দিবসটি পালন করে এসেছি । প্রায় পঁচিশটি বছর প্রবাসে থাকায় আমি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের মাটিতে এই দিনটি পালন করার সুযোগ পাইনি। আজকের এই দিনে গত বছর দুই দশক পেরিয়ে গেলেও বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজসহ সকল চাকরিজীবীদের সাথে একুশের ব্যানার টান-টান ক'রে হাতে নিয়ে এক প্রভাত ফেরির মাধ্যমে শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ক'রে গৌরবে উদ্ভাসিত হয়েছিলাম । রালী শেষে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এক আলোচনা সভায় দিনটির তাৎপর্য নিয়ে বক্তব্যও রেখেছিলাম। ২০২০ সালের আজকের এই দিনটিতে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত আমার সকল সহকর্মী ও স্নেহের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নিয়ে একুশ পালন করতে না পারার যে ক্লেশ তা আমি বুঝাতে পারবো না ! যদিও বিদেশে থেকে এই দিনটির প্রতি এবং ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছি।

৫২-সালের এই দিনে বাংলাকে  তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ক’রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সেই রক্ত ঝরানো দিন আমি চোখে দেখিনি, কিন্তু নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অমর একুশের যে চেতনা তা আমার জন্মের পর বা আমার উপলব্ধির পর হতে ভাষার প্রতি এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ক্রমশই বৃদ্ধি পেয়েছে । ভাষিক জাতীয়তাবাদী চেতনায়, অন্যদিকে সর্বজনীন স্বার্থে প্রগতিবাদী চেতনায় নিজেকে করেছি সর্বদা উজ্জীবিত। ৫২ -এর একুশ আমি দেখি নাই, কিন্তু একুশের সেই আন্দোলনের যে ফসল  অর্থাৎ মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আত্ম-সত্ত্বা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা এবং আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আমাদের যে স্বাধীনতা অর্জন - তা আমি দেখেছি ! জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে  তার নিজের মাতৃভূমি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে - তা আমি দেখেছি ! আমিও তো ছিলাম মনে-প্রাণে একজন সংগ্রামী ! পৃথিবীতে বাঙালি জাতির  মতো ত্যাগের আর কোনো উদাহরণ নেই। তাই ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। একুশের এই অমর শহিদরা যুগ যুগ ধরে বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু ক’রে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছে , অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পথ দেখিয়েছে । আমাদের তরুণ  ও ভবিষৎ প্রজন্ম যেন এই শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে মাথা উঁচু ক'রে বলতে পারে "মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা, মাগো তোমার কোলে তোমার বোলে কতই শান্তি ভালোবাসা" ।